নিজস্ব প্রতিনিধি , বানারহাট | 7 নভেম্বর :
পথ দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ্যে এলেই বারবার উঠে আসছে একই জায়গার নাম—বানারহাট ব্লকের মোরাঘাট মোড় সংলগ্ন এলাকা। কখনও ছোট গাড়ি, কখনও যাত্রীবাহী বাস,
আবার কখনও ভারী যানবাহন দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। অথচ একের পর এক দুর্ঘটনার পরও এই এলাকায় যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে পর্যাপ্ত উদ্যোগ চোখে পড়ছে
না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। প্রশ্ন উঠছে, বারবার দুর্ঘটনার পরও কেন মোরাঘাট মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেই?
শুক্রবার বিকেল প্রায় ৪টা নাগাদ ফের এক ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনা ঘটে মোরাঘাট মোড় সংলগ্ন এলাকায়। জয়গাঁও থেকে বিহারের মুজফফরপুরের উদ্দেশ্যে যাওয়া একটি যাত্রীবোঝাই বাস
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডিভাইডারে ধাক্কা মেরে উল্টে যায়। বাসে প্রায় ১২ থেকে ১৪ জন যাত্রী ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। দুর্ঘটনায় তিনজন আহত হন। তাঁদের প্রথমে বানারহাট হাসপাতালে
নিয়ে যাওয়া হয়। পরে একজনের আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাঁকে জলপাইগুড়ি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
দুর্ঘটনার পর বাসচালক ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গিয়েছেন বলেও জানা গিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন শুধু একটি বাস দুর্ঘটনার নয়। মোরাঘাট মোড় সংলগ্ন এই সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণের অন্যতম পথ। এই এলাকায় হাতি, বাইসন-সহ বিভিন্ন
বন্যপ্রাণীর যাতায়াত রয়েছে। অথচ দ্রুতগতিতে ছুটে চলা যানবাহনের কারণে যেকোনও সময় বড়সড় দুর্ঘটনার পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর প্রাণহানির আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে।
এত গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী চলাচলের পথে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, গতিসীমা নির্ধারণের বোর্ড এবং গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কেন নেই, সেই প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশপ্রেমীরা।
অন্যদিকে, মোরাঘাট মোড় হয়ে ইন্দু-ভুটান সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বালি ও পাথরবোঝাই বড় বড় ডাম্পার যাতায়াত করে। দিনের বেলায় ভারী যানবাহনের
এই চলাচলও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়দের একাংশ। এই পরিস্থিতিতে ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত নজরদারি, যানবাহনের
গতিসীমা পরীক্ষা এবং ভারী যান চলাচলে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
দুর্ঘটনায় পড়া বাসের এক যাত্রী কুমার দাস জানান, বাসে প্রায় ১২ থেকে ১৩ জন যাত্রী ছিলেন। হঠাৎ বাসটি উল্টে যায়। বেশ কয়েকজন আহত হন।
ভাগ্যক্রমে তিনি নিজে বড়সড় আঘাত পাননি। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। দুর্ঘটনার পর চালককে আর ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি।
পরিবেশপ্রেমীদের দাবি, মোরাঘাট মোড় ও সংলগ্ন বন্যপ্রাণী চলাচলের রাস্তায় অবিলম্বে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, নির্দিষ্ট গতিসীমার বোর্ড, রিফ্লেক্টর এবং প্রয়োজন
অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে স্পিড ব্রেকার বা রাম্বল স্ট্রিপ বসানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশের
নজরদারি ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পুলিশি টহল বাড়ানোরও দাবি উঠেছে।এদিকে দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে বানারহাট থানার ট্রাফিক গার্ডের এক পুলিশ
আধিকারিক জানান, দুর্ঘটনায় তিনজন আহত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে দুজনকে বানারহাট হাসপাতালে চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং একজনকে
গুরুতর আঘাতের কারণে জলপাইগুড়ি হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে দুর্ঘটনা ঘটার পর আহতদের
হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়াই কি প্রশাসনের একমাত্র দায়িত্ব? নাকি দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সমান জরুরি?
একই জায়গায় বারবার দুর্ঘটনার পরও যদি গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না করা হয়, তাহলে আগামী দিনে আরও বড় বিপদ ঘটতে পারে।
তাই প্রশাসন, ট্রাফিক বিভাগ, জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ এবং বনদপ্তরের কাছে এলাকাবাসী ও পরিবেশপ্রেমীদের আবেদন, মোরাঘাট মোড়কে দুর্ঘটনাপ্রবণ
এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত যৌথ পরিদর্শন করা হোক। বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা
গড়ে তোলা হোক। মানুষের জীবন এবং বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষায় আর কত দুর্ঘটনার অপেক্ষা