নিজস্ব প্রতিনিধি , উদয়পুর :
রাজ্যের অন্নদাতাদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং তাঁদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য দিতে আরও এক বড় পদক্ষেপ নিল ত্রিপুরা সরকার।
স্থানীয় কৃষকদের সার্বিক কল্যাণের কথা মাথায় রেখে রাজ্য সরকার ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ধান সংগ্রহ অভিযান অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চলতি রবি মৌসুমে সমগ্র রাজ্য থেকে মোট ২০,৭১০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকদের স্বার্থে এই ধান সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত, স্বচ্ছ ও গতিশীল করার লক্ষ্যে শুক্রবার উদয়পুর মহকুমার কাঁকড়াবন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
খাদ্য, নাগরিক সরবরাহ ও ভোক্তা বিষয়ক দপ্তরের উদ্যোগে কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দপ্তরের সহযোগিতা আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ‘খরিফ বিপণন মৌসুম ২০২৫-২৬’ উপলক্ষ্যে ধান সংগ্রহ অভিযানের শুভ উদ্বোধন সম্পন্ন হয়।
প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডঃ মানিক সাহা।উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে কৃষকদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী ডঃ মানিক সাহা বলেন, রাজ্য সরকার কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ধান সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত করতে এবং কৃষকদের জন্য এটিকে সহজ ও স্বচ্ছ করতে সরকার একাধিক কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তিনি আরোও বলেন, কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করাই বর্তমান রাজ্য সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কারণ কৃষকদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলেই গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে, আর গ্রামের উন্নয়ন হলেই সামগ্রিকভাবে ত্রিপুরার প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব।
মুখ্যমন্ত্রী অতীতে কৃষকদের দুর্দশার কথা স্মরণ করে বলেন, কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে চাষাবাদের জন্য চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন এবং বহু সময় ঋণগ্রস্ত হতে বাধ্য হয়েছেন।
তাঁদের এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে স্থায়ী মুক্তি দিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যৌথভাবে বিভিন্ন যুগান্তকারী প্রকল্প চালু করেছে। এই সব কৃষি-বান্ধব প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের ফলে রাজ্যে কৃষি উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনই কৃষকদের ব্যক্তিগত আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষার ওপর জোর দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে কৃষকদের মধ্যে ২.৫৩ লক্ষেরও বেশি ‘মাটি স্বাস্থ্য কার্ড’ বিতরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি ভর্তুকি প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে ২৩৩.৬৩ কোটি টাকার উন্নত কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে।
এই ধান সংগ্রহ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃষকরা কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারবেন। পাশাপাশি, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যাওয়ার ব্যবস্থা চালু থাকায় আর্থিক লেনদেন আরও নিরাপদ ও সহজ হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে খাদ্য, নাগরিক সরবরাহ ও ভোক্তা বিষয়ক দপ্তরের মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী বলেন, ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ধান কেনার মতো এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ কৃষকদের মনে নতুন আশা ও গভীর আস্থার সঞ্চার করেছে।
এই সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই রাজ্যের কৃষি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। যে সমস্ত জমি আগে বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকত, কৃষকরা এখন সরকারি সহায়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সেই সব জমিতেও নতুন করে চাষাবাদ শুরু করেছেন। ফলে সামগ্রিকভাবে কৃষিকাজের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও উৎসাহ বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পূর্বতন সরকারের কড়া সমালোচনা করে খাদ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে সমস্ত জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ধান ক্রয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কৃষকদের কল্যাণে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য বা সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি, যার ফলে কৃষকরা কৃষিকাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন।
বর্তমান ডাবল ইঞ্জিন সরকার কৃষকদের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বদ্ধপরিকর। এটি কেবল একটি সাধারণ সরকারি কর্মসূচি নয়, বরং এর মাধ্যমে কৃষকদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজ্যের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত হচ্ছে।
এদিনের এই অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক অভিষেক দেবরায়, গোমতী জেলা পরিষদের সভাধিপতি দেবল দেবরায়, বিধায়ক জিতেন্দ্র মজুমদার, খাদ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি শান্তনু, উদয়পুর মহকুমা শাসক ত্রিদিব সরকার, খাদ্য, নাগরিক সরবরাহ ও ভোক্তা বিষয়ক দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব এবং পরিচালক সুমিত লোধ, গোমতী জেলার জেলাশাসক রিঙ্কু লাথের এবং বিশিষ্ট সমাজসেবক বিশ্বজিৎ সরকার। সমগ্র অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কাঁকড়াবন পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারম্যান সুপ্রিয়া সাহা।
অনুষ্ঠান শেষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে খরিফ বিপণন মৌসুম ২০২৫-২৬’ উপলক্ষ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সহ অন্যান্য অতিথিরা সবুজ পতাকা নেড়ে এই ধান সংগ্রহ অভিযানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
খাদ্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কৃষকদের যাতায়াতের সুবিধার কথা বিবেচনা করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পর্যাপ্ত পরিমাণে ধান সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
একই সাথে সংগৃহীত ধান দ্রুত পরিবহণ এবং তা সঠিকভাবে মজুত রাখার জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজানো হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিপুল সংখ্যক কৃষক, উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক আধিকারিক এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল নজরকাড়ার মতো। সরকারের এই ধারাবাহিক উদ্যোগে রাজ্যের কৃষক মহলে খুশির হাওয়া লক্ষ্য করা গেছে।