নিজস্ব প্রতিনিধি , অমরপুর | ৮ অক্টোবর :
গোমতী নদীর উপর সেতু রয়েছে, কিন্তু সেই সেতু দিয়ে নিরাপদে পারাপারের নিশ্চয়তা নেই। অমরপুর আরডি ব্লকের মিয়াবাজার থেকে মালবাসা এলাকায় যাতায়াতের
একমাত্র স্টিল ব্রিজটি বর্তমানে এমনই বেহাল অবস্থায় পৌঁছেছে যে প্রতিদিন কার্যত জীবন হাতে নিয়ে পারাপার করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
বাদ যাচ্ছে না স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও। স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোনও বড় দুর্ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত কি প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে? বামফ্রন্ট আমলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের
যাতায়াতের সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে গোমতী নদীর উপর নির্মাণ করা হয়েছিল এই স্টিল ব্রিজ। একসময় এই সেতুই ছিল দুই এলাকার মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ভরসা।
কিন্তু বছরের পর বছর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই সেতুই এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, এই সেতুটির উপর নির্ভরশীল
৬টি গ্রামের প্রায় ১,৫০০ পরিবার। ফলে সেতুটির বেহাল দশা শুধু যাতায়াতের সমস্যা নয়, এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে এলাকার মানুষের জরুরি পরিষেবা পাওয়ার বিষয়টিও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় কোনও দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা গুরুতর অসুস্থতার মতো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা দমকলের মতো জরুরি পরিষেবার গাড়ি
সময়মতো পৌঁছাতে পারে না। ফলে কয়েক মিনিটের জরুরি পরিস্থিতি কখনও কখনও দীর্ঘ অপেক্ষার পরিস্থিতিতে পরিণত হচ্ছে। জীবন রক্ষাকারী পরিষেবাই যদি সময়মতো
পৌঁছাতে না পারে, তাহলে এই যোগাযোগ ব্যবস্থার দায় কার?—প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
সেতুর বিভিন্ন অংশের বেহাল দশা নিয়ে স্থানীয়রা বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
করেছেন। কিন্তু অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি মিলেছে বারবার, বাস্তব কাজ হয়নি। অমরপুরের বিধায়ক রঞ্জিত দাস এবং অমরপুর আরডি ব্লকের তৎকালীন বিডিও উৎপল দাসকে
সঙ্গে নিয়ে সেতুটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংস্কারের আশ্বাস দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কিন্তু সেই আশ্বাসের পরও সেতুর পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পূর্বের সংস্কারকাজ নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, একবার সেতুটি সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী,
স্থায়ী সংস্কারের পরিবর্তে সামান্য জোড়াতালি দিয়েই কাজ শেষ করা হয়। পরবর্তীতে সেই জোড়াতালিও টেকেনি। তবে এই অর্থ বরাদ্দ ও কাজের হিসাব
নিয়ে সরকারি নথি প্রকাশ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে দাবি এলাকাবাসীর।
প্রশ্ন উঠছে—যদি সত্যিই সেতুর সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়ে থাকে,
তাহলে সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে খরচ হয়েছে? কী ধরনের কাজ করা হয়েছিল? কাজের মান যাচাই করা হয়েছিল কি?
আর সংস্কারের পর এত দ্রুত সেতুটি ফের বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছল কেন?এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই এখন চাইছেন এলাকার মানুষ।
বিশেষ করে প্রতিদিন সেতুটি ব্যবহারকারী স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আসন্ন দুর্গাপূজার সময়ে মানুষের যাতায়াত আরও
বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে যেকোনও সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর বক্তব্য, আর নতুন করে আশ্বাস নয়—এবার প্রয়োজন কাজের।
পুজোর আগেই সেতুটির পূর্ণাঙ্গ কারিগরি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশ দ্রুত মেরামত করতে হবে। একই সঙ্গে আগের সংস্কারকাজে কত টাকা
বরাদ্দ হয়েছিল, কত টাকা খরচ হয়েছে এবং কী কাজ করা হয়েছিল—তারও স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি উঠেছে।
পাশাপাশি এই স্থানে একটি পাকা সেতু নির্মাণের দাবি তুলেছেন এলাকাবাসী। এখন দেখার বিষয়, দুর্ঘটনা ঘটার পর প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়, নাকি দুর্ঘটনার আগেই
মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে সেতুটির স্থায়ী সংস্কারে হাত দেয়। কারণ এই সেতু শুধু একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়
এটি প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা। আর সেই ভরসাই যদি ভেঙে পড়ে, তার দায় নেবে কে?