মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আঁচ এবার এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের রোজকার জীবনে। পেট্রোল মিলবে কিনা, রান্নার গ্যাসের দাম বাড়বে কিনা — এই নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের মধ্যে একটা অস্বস্তি ও উদ্বেগ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। সেই পরিস্থিতিতে মানুষকে সরাসরি আশ্বস্ত করতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্রিয় হলেন রাজ্যের খাদ্য, জনসংভরণ ও ভোক্তা বিষয়ক দপ্তরের মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী।
মঙ্গলবার আগরতলার প্রজ্ঞা ভবনের ১ নম্বর হলে তাঁর সভাপতিত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পেট্রোলিয়াম ডিলার এবং এলপিজি গ্যাস সরবরাহকারী এজেন্সির প্রতিনিধিরা এই বৈঠকে যোগ দেন। পাশাপাশি এটি একটি রাজ্যস্তরের ভোক্তা সচেতনতা কর্মসূচিরও অংশ ছিল। সব মিলিয়ে বৈঠকটি ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে শুধু সরবরাহ ব্যবস্থার পর্যালোচনাই হয়নি, বরং আগামীদিনের পরিকল্পনাও ঠিক করা হয়েছে।
রাজ্যে মজুত নিয়ে কোনো চিন্তা নেই
বৈঠকে মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী একেবারে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ত্রিপুরায় এই মুহূর্তে পেট্রোল, ডিজেল বা রান্নার গ্যাস — কোনো কিছুরই কোনো ঘাটতি নেই। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে যে গুজব ছড়াচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই বলে তিনি পরিষ্কার করে দেন। তিনি বলেন, এই ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানো রোধ করাটা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। দপ্তরের আধিকারিক থেকে শুরু করে ডিলার, এজেন্সি সকলকেই এই বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে এবং মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে হবে।
সময়সীমা বাঁধা হয়েছে, কিন্তু কেন?
মন্ত্রী এও জানান, ভবিষ্যতে যাতে কোনো পরিস্থিতিতে সংকট না তৈরি হয়, সেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ মেনে এলপিজি গ্যাস সংগ্রহে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সেই নিয়ম অনুযায়ী শহর এলাকায় ২৫ দিন এবং গ্রামীণ এলাকায় ৪৫ দিন অন্তর গ্যাস সংগ্রহ করা যাবে। এটা কোনো বিধিনিষেধ নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অংশ, যাতে সরবরাহ শৃঙ্খল সুষম থাকে। তবে এই নিয়মটি নিয়ে মানুষের মধ্যে যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি না হয়, সেজন্য শহর ও গ্রাম — দুই জায়গাতেই সচেতনতামূলক প্রচারের ব্যবস্থা করতে ডিলার ও খাদ্য দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী।
কালোবাজারি হলে ছাড় নেই
এই বৈঠকে মন্ত্রী কালোবাজারির বিষয়ে কড়া বার্তাও দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পেট্রোলিয়ামজাত কোনো পণ্য যদি নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা যায়, তাহলে সেই ডিলার বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কেউ যেন এই সুযোগে সাধারণ মানুষকে ঠকানোর চেষ্টা না করে — এই বিষয়ে প্রশাসন সম্পূর্ণ সজাগ থাকবে বলে তিনি জানান। সংকটের গুজব তৈরি করে অতিরিক্ত মজুত গড়ে তোলার চেষ্টাকেও কঠোরভাবে দেখা হবে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
ভোক্তার আস্থাই আসল লক্ষ্য
ভোক্তা সচেতনতার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, শুধু পণ্য সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়, সঠিক দামে সঠিক পণ্য পাওয়ার বিষয়ে ভোক্তাদের সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলাটাও সমান জরুরি। এই বছরের ভোক্তা সচেতনতার থিম হলো 'নিরাপদ পণ্য, আত্মবিশ্বাসী ভোক্তা'। এই থিমকে সামনে রেখেই সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি জানান। ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমন্বয় তৈরি না হলে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না — এই কথাও তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
কারা ছিলেন বৈঠকে
বৈঠকে পেট্রোলিয়াম পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ও ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন খাদ্য দপ্তরের বিশেষ সচিব দেবপ্রিয় বর্ধন এবং অতিরিক্ত সচিব ও অধিকর্তা সুমিত লোধ। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম অধিকর্তা অভিজিৎ বিশ্বাস, দপ্তরের বিভিন্ন পদস্থ আধিকারিকবৃন্দ, ন্যায্যমূল্যের দোকানের প্রতিনিধি, পেট্রোলিয়াম ডিলার ও এলপিজি এজেন্সির প্রতিনিধিরা।
সব মিলিয়ে এই বৈঠক থেকে একটাই বার্তা বেরিয়ে এলো — পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আছে, মানুষ যেন গুজবে কান না দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জীবনযাপন করেন।