চৈত্র মাস মানেই গরমের দাপট, কিন্তু এবার চৈত্রের শুরুতেই ত্রিপুরাবাসীকে সামলাতে হয়েছে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। গত ১৩ই মার্চ থেকে আচমকা শুরু হওয়া কালবৈশাখীর ঝড় এবং টানা ভারী বৃষ্টি রাজ্যের আটটি জেলার বিদ্যুৎ পরিকাঠামোকে একেবারে তছনছ করে দিয়েছে। গাছ উপড়ে তারের উপর পড়েছে, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে বিদ্যুতের খুঁটি, বিকল হয়ে গেছে ট্রান্সফর্মার। গ্রাম থেকে শহর — রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা কয়েকদিনের জন্য অন্ধকারে ডুবে যায়।
তবে এত বড় বিপর্যয়ের মাঝেও একটা ভালো খবর আছে। ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড (টিএসইসিএল)-এর কর্মীরা দিনরাত এক করে কাজ করে বেশিরভাগ এলাকায় মাত্র এক থেকে তিন দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘদিন অন্ধকারে থাকতে হয়নি।
কোথায় কতটা ক্ষতি হলো?
নিগমের ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসু জানিয়েছেন, এই দুর্যোগে সংস্থার মোট ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি টাকারও বেশি। ১৩ থেকে ২২ মার্চের মধ্যে রাজ্যজুড়ে প্রায় ৯০ কিলোমিটারের বেশি বিদ্যুতের তার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ভেঙে পড়েছে ৪০০-রও বেশি খুঁটি এবং অকেজো হয়েছে ৩৭টি ট্রান্সফর্মার।
সার্কেলভিত্তিক হিসাব দেখলে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়:
ধলাই সার্কেল — প্রায় ২৫ কিলোমিটার লাইন ক্ষতিগ্রস্ত, ১৭টির বেশি খুঁটি ভেঙেছে, আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৫০ লক্ষ টাকারও বেশি।
ঊনকোটি সার্কেল — ৪৩.৯ কিলোমিটার তার ছিঁড়েছে, ২২টি খুঁটি ও ৫টি ট্রান্সফর্মার বিকল।
খোয়াই সার্কেল — পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে খারাপ। প্রায় ৫৩ কিলোমিটার লাইন ক্ষতিগ্রস্ত, ৪৪টি খুঁটি এবং ১১টি ট্রান্সফর্মার অকেজো।
সিপাহীজলা সার্কেল — ১৩ ও ১৮ মার্চের ঝড়ে মোট ১০৬টি খুঁটি ভেঙেছে, ২৬.৯ কিলোমিটার তার ছিঁড়েছে, ৮টি ট্রান্সফর্মার ও ৮টি সাবস্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত।
দক্ষিণ ত্রিপুরা সার্কেল — সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অর্থাৎ ১০৯টি খুঁটি উপড়ে পড়েছে, ৩৭.৩ কিলোমিটার তারের ক্ষতি।
গোমতী সার্কেল — ৯.৩৩ কিলোমিটার লাইন ক্ষতিগ্রস্ত, ৭৫টি খুঁটি ও ১৩টি ট্রান্সফর্মার বিকল।
উত্তর ত্রিপুরা সার্কেল — ১৬ কিলোমিটার লাইন ও ১৮টির বেশি খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত, সাথে ৪টি সাবস্টেশনও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করেছেন কর্মীরা
এত বিশাল ক্ষয়ক্ষতির পরও যে বিষয়টি সবার নজর কেড়েছে তা হলো নিগমের কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম। ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি, প্রতিকূল আবহাওয়া — কিছুই তাদের থামাতে পারেনি। ছেঁড়া তার মেরামত, নতুন খুঁটি বসানো, বিকল ট্রান্সফর্মার ঠিক করা — সব কাজ একসাথে চলেছে। বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মাত্র এক থেকে তিন দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক করে তোলা সম্ভব হয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।
সাধারণ মানুষের প্রতি সতর্কবার্তা
বিশ্বজিৎ বসু সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, ঝড়ের পর ছেঁড়া তার বা ক্ষতিগ্রস্ত খুঁটির কাছে ভুলেও যাওয়া উচিত নয়, এটা মারাত্মক বিপজ্জনক। এ ধরনের কিছু চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ বিদ্যুৎ নিগম কার্যালয়ে খবর দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
পরিকাঠামো পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফেরাতে আরও সময় লাগবে, সেটা স্বীকার করেই নিগম জানিয়েছে — চ্যালেঞ্জ যতই বড় হোক, পরিষেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে তারা সরে আসবে না।